জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:
টেকনাফসহ জেলাজুড়ে নামে বেনামে যত্রতত্র বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের পুর্ব প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদনহীন এসব বৃত্তি পরীক্ষায় ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে পরীক্ষার নামে অভিভাবকদের মাঝে এক ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগীতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর এসব বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষা বিভাগের কোন নজরদারী নেই বলে জানাগেছে। শিক্ষা অফিসের নজরদারী এবং নিয়ন্ত্রণ না থাকায় পছন্দের স্কুল-মাদরাসায় বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ যেমন রয়েছে। তেমনি খাতা মুল্যায়নে স্বজনপ্রীতি। ফলাফলে কারসাজি। মার্কশীট সরবরাহে অসম্মতি। খাতা মুল্যায়নের আবেদন করলেও প্রদর্শন না করায় শিক্ষক ও অভিভাবকদের বড় একটি অংশ বৃত্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজেদের চরম অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধিরা অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ, অস্বচ্ছ মুল্যায়ন এবং আর্থিক বোঝা শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন। তারা যত্রতত্র নামে বে-নামে অনুমোদনহীন বৃত্তি পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর নজরদারীর দাবী জানিয়েছেন। পাশাপাশি মানহীন বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ করতে সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
জানাগেছে, বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মেধা যাছাই ও মেধা বিকাশ এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগী মনোভাব তৈরী হয়। অন্যদিকে পরীক্ষা ভীতিতে ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে অতি মাত্রায় মানসিক চাপও সৃষ্টি হয়। অভিভাবকদের মাঝে সৃষ্ট অসুস্থ প্রতিযোগীতার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের অনেককে অনাকাংখিত আচরণ করতে দেখা গেছে। বৃত্তির উদ্দেশ্য মহৎ কিন্তু কর্ম পদ্ধতি যথাযথ না হওয়ায় উপকারের চেয়ে অপকার বেশী হচ্ছে বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন।
জানাগেছে,নভেম্বর মাসের শেষের দিকে সরকারী-বেসরকারী স্কুল-মাদরাসা সমুহে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নুরানী মাদরাসা সমুহের বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষা উপলক্ষে বর্তমানে স্কুল-মাদরাসার ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে এক ধরণের উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকরা জানায়, বার্ষিক পরীক্ষার পরপরই ছাত্র/ছাত্রীরা বাবা-মায়ের সাথে আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে উৎগ্রীব হয়ে আছেন। এরই মাঝে মেধা যাছাইয়ের নামে যত্রতত্র বৃত্তি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ছাত্র/ছাত্রী এবং অভিভাবকদের মাঝে উৎকণ্ঠার উপর আরেক উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, টেকনাফে গাজী কামরুল ইসলাম স্মৃতি, মেরিন সিটি, জাহাজপুরা, প্রতিভার আলো,মাষ্টার আমির আলী, হ্নীলা একাডেমী, সৈয়দ আজিম ট্রাস্ট, উপজেলা কিন্ডার গার্ডেন এসোসিয়েশন, গুহাফা ও কিশোর কন্ঠসহ পুরো কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলায় নামে বেনামে আরো অনেক বৃত্তি পরীক্ষা রয়েছে। ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ট, ৭ম ও ৮ম শ্রেনীর ছাত্র/ছাত্রীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করছেন। এছাড়া বেগম রোকেয়া স্মৃতি বৃত্তিতে নার্সারী থেকে মাধ্যমিক স্তুর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরও অংশ গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে ১৫০-২৫০ টাকা পর্যন্ত ফি: জমা দেওয়া বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। নির্ধারিত ফি ছাড়া কোন ছাত্র/ছাত্রী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেনা বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এদিকে বৃত্তির নামে বড় ধরণের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলছেন অভিভাবক ও শিক্ষক সমাজের অনেকে।
সচেতন অভিভাবক ও বিএনপি নেতা বাহাদুর শাহ তপু এবং অপর এক অভিভাবক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রফিকুল ইসলাম অপি জানান, যত্রতত্র বৃত্তির নামে এসব ভাঁওতাবাজি। তাঁরা প্রায় সব বৃত্তি পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। পাশাপাশি বার্ষিক পরীক্ষার পরে ছাত্র/ছাত্রী বেড়াতে যাবে এমন সময়ে বৃত্তির আয়োজন অযৌক্তিক এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের কারণ বলে জানান।
টেকনাফ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও হ্নীলা পানখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাষ্টার মাহমুদুর রহমান জানান,বাচ্ছাদের জন্য এসব অস্থির বিষয়। বেশীর ভাগ অভিভাবক ও ছাত্র/ছাত্রী এতে অভ্যস্ত নন। বৃত্তি দিচ্ছেন ১হাজার; আর বৃত্তি পাচ্ছেন ১০/২০জন ছাত্র/ছাত্রী। এতে করে মেধাবীদের অনেকে বৃত্তি না পেয়ে ছাত্র/ছাত্রী এমনকি শিক্ষকরাও মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়েন। শিক্ষা অফিসের সম্পৃক্ততা ছাড়া যত্রতত্র বৃত্তির আয়োজনে স্বচ্ছতা নিয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করেন। খাতা মুল্যায়নসহ অনেককিছুতে তিনি দ্বিমত পোষণ করে বলেন, বৃত্তির নামে শিশুদের মানসিক যন্ত্রণা আদৌ কাম্য নয় বলে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির এই নেতা মানহীন যত্রতত্র বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধের দাবী জানিয়েছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাষ্টার আব্দুস সালাম বলেন, সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে আবারো বৃত্তি পরীক্ষার প্রচলন করেছেন। সুতরাং নামে বেনামে মানহীন বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণে অভিভাবকদের আর্থিক ক্ষতিসাধন এবং শিশুদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বার্ষিক পরীক্ষার পরে শিক্ষার্থীরা যেখানে বেড়ানোর পাশাপাশি বিনোদন নেওয়ার কথা। সেখানে নামে বেনামে বৃত্তি পরীক্ষা ছাত্র/ছাত্রীদের বার্ষিক বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর অভিভাবকরাও বৃত্তির পাওয়ার লোভে ছেলে মেয়েদের মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন। এছাড়া বৃত্তির নামে ছাত্র/ছাত্রীরা অহেতুক মানসিক যন্ত্রণা ও ভোগান্তি পড়ছেন কিনা? বিষয়টি ভেবে দরকার বলে তিনি মনে করেন।
জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এড. মোস্তাফা কামাল চৌধুরী মুসা জানান, বেসরকারী বৃত্তির নামে টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় মানসিক চাপ ও শিশুদের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি করা হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ, অস্বচ্ছ মুল্যায়ন এবং আর্থিক বোঝা শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে।
বিত্তশালী ব্যক্তিদের নাম প্রচার ও সামাজিক পরিচিতি বৃদ্ধির প্রলোভন দেখিয়ে অনুদান সংগ্রহ করে বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে কিনা? তা-ও খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, মেধা যাছাইয়ের পরিবর্তে প্রচার, অর্থ সংগ্রহ কিংবা ব্যাক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হয়ে উঠলে তা শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের আস্থার পরিপন্থী বলে এই শিক্ষাবিদ মনে করেন। তিনি স্বচ্ছ আয়োজন, নিরপেক্ষ মুল্যায়ন, আর্থিক জবাবদিহিতা, শিশুদের স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত কল্পে কারসাজি এবং স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে উঠে মানসম্মত বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজনে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততার উপর জোর দেন।
জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা জানান, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের সাথে সমন্বয় রেখে বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন করতে হবে। মেধা যাছাইয়ের নামে মানহীন এবং অস্বচ্ছ বৃত্তি পরীক্ষা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবেনা।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম. অনীক চৌধুরী বলেন,বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র/ছাত্রীদের কোন প্রকার বাধ্য করা যাবেনা। যদি কেউ বাধ্য করেন; অভিযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরীক্ষা পদ্ধতি ও খাতা মুল্যায়নে অস্বচ্ছতা এবং স্বজনপ্রীতির প্রশ্নে তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসের সাথে সমন্বয় রেখে, স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে উঠে, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই বেসরকারী বৃত্তির পরীক্ষার আয়োজন করতে হবে।